বাংলাদেশে মার্কসবাদ

আত্মপক্ষ
এবনে গোলাম সামাদ

কার্ল মার্কস বলেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রথমে প্রবর্তিত হয় বিলাতে। এশিয়ার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রথম প্রবর্তিত হবে ব্রিটিশ শাসিত ভারতে। কেননা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ ভারতে খুলছে রেলপথ। ফলে সেখানে প্রবর্তিত হচ্ছে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেখানে আবিষ্কার করেছে পাথুরে কয়লার খনি। ফলে ব্রিটিশ-ভারত পৌঁছে যাচ্ছে আধুনিক যন্ত্রযুগে। যন্ত্র বিপ্লবের হাত ধরে আসবে সমাজতন্ত্র। কিন্তু মার্কসের এই ভবিষ্যৎবাণী খাটেনি। বিলাতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেনি। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সূচিত হয়নি ব্রিটিশ শাসিত ভারতে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু বলেছিলেন, তিনি চাচ্ছেন ভারতে গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতির প্রবর্তন। তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীও বলেছিলেন অনুরূপ কথা; কিন্তু বর্তমানে ভারতের কংগ্রেস দল আর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনের কথা বলছে না। ভারতে কংগ্রেস দল এখন ক্ষমতাতেও নেই। বিজেপি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করে মিশ্র অর্থনীতিতে। আর এ ক্ষেত্রে সে ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে; রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর নয়। মার্কসবাদ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের ফলে। কিন্তু এখন ভেঙে পড়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। জানা যাচ্ছে, রাষ্ট্রিক উদ্যোগে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দুর্বল দিকগুলোকে। আর তাই বিভিন্ন দেশে এখন পরিত্যক্ত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অর্থনৈতিক জীবন পরিচালনার ধারণা।
কার্ল মার্কসের চিন্তাচেনতা চিরকাল এক হয়ে থাকেনি। মার্কসবাদ নিয়ে আলোচনা করতে হলে তাই প্রশ্ন দেখা দেয় আসলে মার্কসবাদ বলতে ঠিক কী ধরনের মতাদর্শকে বুঝতে হবে। মতাদর্শের প্রশ্নে কিছু ঐকমত্য হলেও প্রশ্ন ওঠে মতাদর্শকে কিভাবে রূপায়ণ করা হবে সে সম্বন্ধে। ভøাদিমির উইলিয়ানভ ইলিচ লেনিন গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন একমাত্র একটি বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে বিপ্লব ঘটা সম্ভব। তাই একটি বিপ্লবী দলকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে অগ্রসর হতে হবে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ার পথে। মার্কসবাদে এ রকম বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা দখলের কথা বলা হয়েছে। অন্য দিকে আরেক দল বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও আইন করে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ধাপে ধাপে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর। মার্কসবাদ থেকে এই মতেরও সমর্থন পাওয়া যায়। কেননা, কার্ল মার্কস ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বিলাতে চার্টিস্ট আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। চার্টিস্টদের দাবি ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের সর্বজনীন ভোটাধিকার; তাদের এমপি হিসেবে প্রার্থী হওয়ার অধিকার; নির্বাচনে দাঁড়াবার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পত্তি থাকার প্রয়োজন হবে না; নির্বাচন এলাকা হতে হবে প্রধানত প্রায় সমসংখ্যক নির্বাচকমণ্ডলী নিয়ে; প্রতি বছর পার্লামেন্টে অন্তত একবার করে অধিবেশন হতে হবে। কার্ল মার্কস চার্টিস্টদের এসব দাবি সমর্থন করেছিলেন এবং বলেছিলেন বিলাতের স্বল্প আয়ের মানুষরা সে দেশে আইনের মাধ্যমে তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে; কিন্তু তিনি ও তার বন্ধু ফেডরিক এঙ্গেল্্স তাদের রচিত সাম্যবাদী ঘোষণাপত্রে (Communist Manifesto) ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষণা করেন, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করবার কথা। লেনিন তার চিন্তাচেতনায় কার্ল মার্কস ও ফেডরিক এঙ্গেলসের রচিত সাম্যবাদী ঘোষণাপত্রকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এমনকি বিলাতের গণতন্ত্রকেও বলছেন, বড়লোকের গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রে কেবল বড়লোকেরাই টাকা দিয়ে ভোট কিনে নির্বাচিত হতে পারে।
লেনিন সাধারণ মানুষের কোনো বিচারবুদ্ধি আছে বলে মানতে চাননি। তাদের ভেবেছেন কেবলই টাকার কাঙাল। বাংলাদেশে মার্কসবাদের লেনিনবাদী ভাষ্য প্রাধান্য পেতে পেরেছিল। আর তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ল. ই. ব্রেজনেভের পরামর্শে এ দেশে গঠিত হতে পেরেছিল বাকশাল। বাংলাদেশে মার্কসবাদ হয়ে দাঁড়ায় গণতন্ত্রবিরোধী একটা ভাবাদর্শ। শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন গণতন্ত্রের কথা বলে শেষে ১৯৭৫ সালে কেন বাকশাল গড়বার কথা ভাবতে পেরেছিলেন, সেটা এখনো হয়ে আছে রহস্যময়। তবে অনেকে অনুমান করেন, এর পেছনে ছিল শেখ ফজলুল হক মণির বিশেষ চাপ। তিনি হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের মধ্যে এ সময় তার মাতুলের চাইতেও অর্থাৎ শেখ মুজিবের চাইতেও ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব। শেখ মুজিবের বোনজামাই সেরনিয়াবাত বহু আগে থেকেই ছিলেন মার্কসবাদ, লেনিনবাদে দীক্ষিত। এ সময় তার প্রভাবও আওয়ামী লীগে হয়ে উঠেছিল খুবই প্রবল। সম্ভবত শেখ মুজিব, শেখ মণিও সেরনিয়াবাতের চাপ কাটাবার জন্যই গড়তে রাজি হন বাকশাল। আমরা তাই দেখি বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক; যিনি মার্কসবাদ লেনিনবাদে আদৌ আস্থাবান ছিলেন না। প্রফেসর আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘আমরা টের পাই, আমাদের সবার মধ্যে শেখ মণিকেই বেশি খাতির করছে সোভিয়েত-কর্তৃপক্ষ। মস্কোর এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে বুঝি, তার ধারণা এবং নিশ্চয় আরো অনেকের যে, মণি আসলে কমিউনিস্ট এবং বাংলাদেশে যদি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার নেতৃত্বেই হবে। ঢাকায় রুশ দূতাবাসের অতি সজ্জন কাউনসেলরকে দেখি মণির সেবায় সদাব্যস্ত। মস্কোর নানাজন আসেন মণির সঙ্গে দেখা করতেÑ কাউনসেলর দোভাষীর কাজ করেন, হাবেভাবে মনে হয়, দর্শনপ্রার্থীরা সবাই কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্টজন (নতুন যুগের ভোরে: শব্দঘর, জানুয়ারি ২০১৮, পৃষ্ঠা- ১২৩)।’ বাংলাদেশে এখন মার্কসবাদ বলতে বোঝান হচ্ছে দেশে এক দলের সরকারকে প্রতিষ্ঠা করা এবং তার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়া। কিন্তু বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে গেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই। আর সারা পৃথিবী ঝুঁকতে শুরু করেছে সমাজতন্ত্রকে বাদ দিয়ে বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করার দিকে। কেননা, সমাজতন্ত্রে অর্থনৈতিক দ্রব্যের উৎপাদন না বেড়ে কমে যেতেই থাকে। একটা দেশে বাড়ে অর্থনৈতিক অভাবের মাত্রা। সমাজতন্ত্রের ধারণা তাই আর আগের মতো সারা বিশ্বে আদ্রিত নয়।
কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) জন্মেছিলেন জার্মানির পূর্বভাগে অবস্থিত, ঞৎরবৎ শহরে। তিনি মারা যান লন্ডন শহরে। লন্ডনে তিনি জার্মানি থেকে পালিয়ে এসে বাস করেছিলেন দীর্ঘ বিশ বছর। গবেষণা করেন লন্ডন-ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় এ বছর মে মাসের পাঁচ তারিখে কার্ল মার্কসের জন্মতিথি নিয়ে খুব ঘটা করে নানা কিছু লেখা হলো। জানি না, এ দেশের পত্রপত্রিকায় কার্ল মার্কসকে নিয়ে এত ঘনঘটা করবার কারণ কী থাকতে পারে। কেননা, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়েই মার্কসবাদ নিয়ে আগের সেই মাতামাতি আর নেই। চীনে কমিউনিস্ট পার্টি এখনো ক্ষমতায় থাকলেও তারা আর বলছে না সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়বার কথা। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা এখন হয়ে পড়েছে খুবই রদ্দি।
কার্ল মার্কসের চিন্তাচেতনার সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ ধরা পড়েছে তার লেখা উধং কধঢ়রঃধষ (১৮৬৭) গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে । এখানে মার্কস অর্থনীতি বলতে বুঝিয়েছেন, প্রধানত উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদনী সম্পর্কের আলোচনাকে। উৎপাদিকা শক্তি বলতে বুঝায়, অর্থনৈতিক দ্রব্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ, উৎপাদনের কৃতকৌশলের স্তর প্রভৃতি যা কিছু উৎপাদনের কাজে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে আনুকূল্য প্রদান করে, তাদের সব কিছুকে। অন্য দিকে উৎপাদনী সম্পর্ক বলতে বোঝায়, উৎপাদনে অংশগ্রহণ করবার সময় অংশগ্রহণকারী মানুষগুলোর মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাকে। এই দু’দিক থেকে বিচার করলে যেকোনো উৎপাদন প্রণালীকে বোঝা সহজ হয়ে ওঠে। এ দিক থেকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির একটি উপযোগিতা এখনো সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে থেকে গেছে।হ
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.