জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর

শোক ও হুঁশিয়ারির দিন

কামেল হাওয়াশ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নিয়ে ট্রাম্প যখন আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, তখন ইসরাইলকেও বুঝতে হবে, ফিলিস্তিনি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংগ্রাম থেকে কখনো সরে আসবে না।
ফিলিস্তিনের আকাশে আবারো ওড়াউড়ি করছে পুরনো শকুন। এটি এমন একসময়, যখন ফিলিস্তিনিদের হৃদয় ছিন্নভিন্ন। ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের জন্য এই জেরুসালেম শহরটি হিংস্র জানোয়ারদের কামড়ে ধরার প্রায় ৭০ বছর পর। এখানে এমন এক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যেখানে আর কোনো শান্তির পায়রা অবশিষ্ট থাকবে না।
গেল সোমবার মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেয়া উদযাপন করেছে ইসরাইল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছেন, এটি করে তিনি ফিলিস্তিনিদের মুক্তির আকাক্সা মন থেকে মুছে ফেলতে পেরেছেন। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আর কখনো প্রতিষ্ঠা হবে না, এমন ভাবনা তাদের জোর করে গ্রহণ করাতে পেরেছেন।

নাকবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ব্যর্থতা
‘স্বাধীন বিশ্বের নেতা’ তার জামাই ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার, তার আন্তর্জাতিক সমঝোতাবিষয়ক বিশেষ দূত জ্যাশন গ্রিনবাট এবং তার কন্যা ও একই সাথে উপদেষ্টা ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যানের সাথে এই দূতাবাস স্থানান্তর ও ইসরাইলের ৭০তম স্বাধীনতা উদযাপন করতে ইসরাইলে পাঠিয়েছেন। তার কন্যাসহ এই চারজনের সবাই খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্মে দীতি হয়েছে এবং ইসরাইলি নাগরিকত্ব গ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের হৃদয় ও মন পুরোপুরি ইসরাইলের জন্য নিবেদিত।
যারা সত্যিকারের ইহুদিবাদী এবং বিশ্বাস করে যে, ফিলিস্তিন একদিন তাদের হবে; তাদের মতোই এরাও আদি ফিলিস্তিনিদের সমস্যা হিসেবেই মনে করে। বিরোধীপ ও আক্রমণকারীদের প্রতি সুনিশ্চিতভাবেই যারা ্যাপা, এসব আদিবাসীদেরও এই চারজন এমনই মনে করে।
দখলদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রটির সামরিক বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যে স্যুট-টাই পরা এসব তথাকথিত সভ্য মানুষ এমন একটি বিষয় উদযাপন করতে এসেছে, যা নগ্ন সশস্ত্র ডাকাতি।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি ট্রাম্পের এই প্রতিনিধিদলের সদস্যদের যদি ন্যূনতম নৈতিক মমত্ববোধ থাকত তাহলে তারা পরের দিন ফিলিস্তিনিদের বিপর্যয় বা ‘নাকবা’র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের সাথে যোগ দিত। তারা বা তাদের নিমন্ত্রণকারী কারোরই ফিলিস্তিনিদের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছিল, সে ব্যাপারে কোনো অনুশোচনা নেই এবং তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতিও নেই। ইসরাইলের স্বাধীনতা দিবসে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং উদ্দেশ্যমূলক, পূর্বপরিকল্পিত ও অনৈতিক।
এই পদপেকে কেবল এই অর্থে নেয়ার জন্যই ফিলিস্তিনিদের শাস্তি দেয়া হতে পারে যে, নিজেদের বৈধ অধিকারটুকু না পেয়ে তারা কেবল তাদের ঘৃণাই করে।
দখলদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রটির সামরিক বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যে স্যুট-টাই পরা এসব তথাকথিত সভ্য মানুষ এমন একটি বিষয় উদযাপন করতে এসেছে, যা নগ্ন সশস্ত্র ডাকাতি। জেরুসালেম ফিলিস্তিনিদের কাছে থেকে দুই দফায় কেড়ে নেয়া হয়েছে, পশ্চিম অংশ ১৯৪৮ সালে এবং পূর্ব জেরুসালেম ১৯৬৭ সালে। ইসরাইল কর্তৃক পূর্ব জেরুসালেমের অবৈধ সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ীও অবৈধ। যদিও এখনো তারা এই অংশের দখল বজায় রেখেছে।
জেরুসালেমের এই অংশকে আন্তর্জাতিকভাবে বলা হয় ‘অবৈধভাবে দখল করে রাখা’ অঞ্চল। এই অবৈধ দখলের বিষয়টি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ ২০০৪ সালে, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা ২৩৩৪ অনুযায়ী এবং ইউনেস্কো ২০১৭ সালে ঘোষণা দিয়েছে।

ইসরাইলের যুক্তি
ট্রাম্প সত্যিই যদি ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান চাইতেন এবং তিনি যদি চাইতেন- দু’টি রাষ্ট্রই শান্তিপূর্ণভাবে জেরুসালেমের পবিত্র ভূমি ভাগাভাগি করুক, তাহলে তিনি পশ্চিম জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী এবং পূর্ব জেরুসালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করতেন।
জেরুসালেম শহরকে অবিভক্ত রাখাসহ তিনি এমন কিছু শর্ত নির্ধারণ করতে পারতেন, যা অবৈধ বসতি নির্মাণ বন্ধ করত এবং যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হতো। একই সাথে জনসংখ্যা চিত্র ও ইসরাইলের কট্টর ইহুদিবাদী নীতিও কিছুটা শিথিল হতো।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যভাবে বললে, ইসরাইল যেসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে, তিনিও সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি একটি সময়সীমাও নির্ধারণ করতে পারতেন, যাতে করে ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হতে পারত এবং উভয় পরে মধ্যে বিবদমান সব সমস্যা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সমাধান করতে পারতেন।
এর পরিবর্তে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যভাবে বললে, ইসরাইল যেসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে, তিনিও সেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টর ইসরাইলপন্থীরা তাকে বুঝিয়েছে, তার এই সিদ্ধান্তই কেবল পারে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্য সবাই এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ উভয় পরিষদই এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে। তবে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সত্যিকারের শান্তি প্রক্রিয়ায় আনতে জাতিসঙ্ঘ কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে িেপয়ে তুলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পরই এসব প্রতিবাদ-বিােভ আর স্থায়ী হয়নি এবং এই ােভকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিরা বা তার বন্ধুরা সঠিক কৌশলগত পথে এগোতেও পারছে না।

দখল প্রতিষ্ঠা
যাই হোক, এই সিদ্ধান্ত, প্রত্যাবর্তনের শান্তিপূর্ণ মিছিলকে দ্রুত গুটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছে। সেই সাথে ১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে, গাজার ফিলিস্তিনিরা এখন সেই সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে। ফিলিস্তিনিরা সারা বিশ্বকে আরো একবার মনে করিয়ে দিয়েছে, ৭০ বছর আগে যে মাতৃভূমি থেকে তাদের বিতাড়িত করা হয়েছিল, তারা এখনো সেখানে ফেরার অপোয় আছেন। ইসরাইল যেরকম পরিস্থিতিই সৃষ্টি করুক না কেন, মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার তারা কখনো ছেড়ে দেবে না।
ইসরাইল শক্তি প্রয়োগ করে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। শান্তিপূর্ণ বিােভে তারা গুলি চালিয়েছে। বিােভ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকেও সাংবাদিক ও চিকিৎসকেরা ইসরাইলি স্নাইপারে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। জবরদখল প্রতিষ্ঠা করার জন্য তারা যা কিছু পেয়েছে ছিনিয়ে নিয়েছে, যা যা করার সুযোগ পেয়েছে; করেছে। ফিলিস্তিনিদের দমিয়ে রাখার জন্য এবং ইহুদিবাদী প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই শক্তি প্রয়োগ চলতেই থাকবে।
ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়নকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাকি ফিলিস্তিনিদের কী হবে? তিনি বলেছিলেন, ‘বৃদ্ধরা মরে যাবে আর তরুণেরা ভুলে যাবে’। তিনি যা ভেবেছিলেন, সে অনুযায়ী বৃদ্ধরা মরেছে ঠিকই, তবে তরুণেরা ভুলে যায়নি।
মাতৃভূমি ফিলিস্তিনের প্রতিইঞ্চি মাটির সাথে তাদের যে আত্মিক সম্পর্ক তা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তর হয়েছে। ইসরাইলকে শুধু জর্ডান ও ভূমধ্যসাগরের তীরে বসবাসকারী এই ছয় মিলিয়ন ফিলিস্তিনির সাথেই লড়লেই হবে না, বরং আরো যে ছয় মিলিয়ন ফিলিস্তিনি ফেরার অপোয় আছে, তাদের সাথেও যুদ্ধ করতে হবে। আর এটাই সত্য, ট্রাম্প না বুঝলেও ইসরাইলিরা ঠিকই বুঝতে পেরেছে এবং তারা তা প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছে।

প্রতিরোধের মুখে জীবন
আমার বাবা-মা দুইজনই জেরুসালেমে জন্মেছেন। বাবা মারা গেলেও মা এখনো বেঁচে আছেন; কিন্তু তার জন্মভূমিতে ফেরার অধিকার নেই। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসবাস করা একজন ইহুদি নারী, তার সাথে কোনো সম্পর্ক থাক বা না থাক, তিনি চাইলেই জেরুসালেমে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং ইসরাইল তাকে স্বাগত জানিয়ে নাগরিকত্ব দেবে; কিন্তু আমার মা ফিরতে পারবেন না।
এই পবিত্র ভূমিতে শান্তি তখনই আসবে, যখন আমার মা এখানে ফিরতে পারবেন এবং যখন ইহুদি ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবে, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে এবং শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করবে না।
ট্রাম্পের মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর মাতৃভূমি ফিলিস্তিনের জন্য লজ্জার ও শোকের। কিন্তু একই সাথে এই ঘটনা ইসরাইলের জন্য হুঁশিয়ারিও যে, তরুণ ফিলিস্তিনিরা এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত, নিজের মাতৃভূমিতে বসবাসের অধিকার অর্জন না করা পর্যন্ত এবং ঔপনিবেশিক শকুনের হাত থেকে জেরুসালেম মুক্ত না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

কামেল হাওয়াশ : ব্রিটিশ-ফিলিস্তিনি। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলের অধ্যাপক। দীর্ঘ দিন তিনি ন্যায়বিচারের জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য। তিনি ব্রিটিশ ফিলিস্তিন পলিসি কাউন্সিল বিপিপিসির ভাইস চেয়ারম্যান ও ফিলিস্তিন সলিডারটি ক্যাম্পেইন পিএসসির নির্বাহী কমিটির সদস্য।হ

মিডলইস্ট আই থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম

 

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.